• ই-পেপার

একান্ত সাক্ষাৎকারে খাগড়াছড়ি মং সার্কেলের অষ্টম রানি উখেংচিং মারমা

ষড়যন্ত্রের কথা বলে মূল সমস্যাগুলো আড়াল করা হয়

  • জন্ম খাগড়াছড়ির মহালছড়ি উপজেলার চোংড়াছড়ি গ্রামে। যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে (এমআইটি) লিঙ্গুইস্টিক অ্যান্ড ফিলোসফি বিষয়ে মাস্টার্স করেছেন। বাংলাদেশে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে এমআইটিতে মাস্টার্স করা প্রথম ব্যক্তি উখেংচিং মারমা। খাগড়াছড়ি মং সার্কেলের অষ্টম রানি তিনি। এমআইটিতে পড়া, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীগুলোর ভাষা, শিক্ষা, রাজনীতিসহ নানা বিষয়ে এই গবেষকের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন পিন্টু রঞ্জন অর্ক

ভোটাধিকার প্রয়োগ হোক ভয়ের ঊর্ধ্বে

মিমোসা সাহা,শিক্ষার্থী, পরিসংখ্যান বিভাগ (মাস্টার্স) পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

ভোটাধিকার প্রয়োগ হোক ভয়ের ঊর্ধ্বে

আমি এমন একটি নির্বাচন চাই, যা হবে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক। নির্বাচনে যেন সত্যিকার অর্থে জনগণের মতামত প্রতিফলিত হয় এবং ভোটের ফলাফল নিয়ে যেন কোনো সন্দেহ বা প্রশ্ন না থাকে। আমি চাই, ভোটাধিকার প্রয়োগ হবে ভয়ের ঊর্ধ্বে থেকে, যেখানে একজন নারী ভোটার বা প্রার্থী হিসেবে কাউকে আলাদা করে চিন্তা করতে হবে না।

নির্বাচনের পরিবেশ অবশ্যই শান্তিপূর্ণ, সহিংসতামুক্ত ও নিরাপদ হওয়া দরকার। বিশেষ করে নারী ভোটার ও সংখ্যালঘু ভোটারদের জন্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা খুবই জরুরি। ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার পথে কিংবা ভোট দেওয়ার সময় এবং ভোট দিয়ে বাড়ি ফেরার সময় যেন কোনো ধরনের হয়রানি, হামলা, ভয়ভীতি বা প্রভাব বিস্তারের শিকার হতে না হয়। প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী ও নির্বাচন কমিশনের সক্রিয় ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ভোটাধিকার প্রয়োগ হোক ভয়ের ঊর্ধ্বেনির্বাচনের ক্ষেত্রে নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। পেশিশক্তির ব্যবহার, কালো টাকার প্রভাব, ভোট কারচুপি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব ছড়ানো এবং নারী প্রার্থীদের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিএসব বড় সমস্যা। অবৈধ অস্ত্র, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও সরকারবিরোধী পক্ষের বাধাএসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কঠোর আইন প্রয়োগ প্রয়োজন। ভোটকেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি বৃদ্ধিও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

গণভোট ও সংস্কার নিয়ে আমার ভাবনা হলো, গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে জনগণের সরাসরি মতামত নেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি নির্বাচনব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সংস্কার, যেমননির্বাচন কমিশনের পূর্ণ স্বাধীনতা, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার এবং রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নিশ্চিত করা খুবই জরুরি।

নির্বাচিত সরকারের কাছে আমার প্রত্যাশা থাকবে, তারা যেন জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ থাকে, নারীর অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে সমান সুযোগ সৃষ্টি করে এবং গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালো পরিবেশ তৈরি করার কার্যকর উদ্যোগ নেয়। একটি দায়িত্বশীল সরকারই পারে একটি ন্যায়ভিত্তিক ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গড়ে তুলতে। দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রেখে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা, মব দমন, দুর্নীতি কমানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অগ্রাধিকার চাই। একটি স্বনির্ভর, সুন্দর, মাদক ও দুর্নীতিমুক্ত, ধর্মনিরপেক্ষ, শক্তিশালী অর্থনীতির নতুন একটি বাংলাদেশ চাই।

বিক্রয়যোগ্য নাগরিকই ক্রীতদাস

ইফতেখার শারিকুল, শিক্ষার্থী, আর্কিটেকচার বিভাগ পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

বিক্রয়যোগ্য নাগরিকই ক্রীতদাস

আমি এমন একটি নির্বাচন চাই, যেখানে পাঁচ বছর পর পর যে হুল্লোড়টি আমাদের দেশে হয়—ক্ষমতাধর ব্যক্তি ও সংগঠনের মধ্যকার ক্ষমতায় আরোহণের সংগ্রাম, গদি ভাগাভাগির বোঝাপড়া এবং ভোট কেনার প্রতিযোগিতা—তা আর হবে না। গণতন্ত্র যে অধিকারের ভিত্তিতে নাগরিকদের নেতা নির্বাচন করার সুযোগ দেয়, সেই অধিকার যেন বিক্রয়যোগ্য না থাকে। ভোটাধিকার বিক্রি হয়ে গেলে নাগরিক প্রজায় পরিণত হয়। ফলে এই বদ্বীপের স্বাধীনতার পরেও এখানকার বাসিন্দারা নাগরিক হয়ে ওঠার সুযোগ পেয়েও প্রজাই থেকে গেছে। রাজা কিংবা জমিদারের পদগুলো দখল করেছে নব্য তালুকদাররা। এই তালুকদারদের সংসদে আইন প্রণয়নের ব্যাপারে তেমন আগ্রহ প্রকাশ করতে দেখা যায় না। তারা তাদের পাইক-পেয়াদা দিয়ে মাঠঘাট, হাট-বাজার থেকে খাজনা আদায়ের সংস্কৃতি অব্যাহত রেখেছে।

বিক্রয়যোগ্য নাগরিকই ক্রীতদাসনির্বাচনের পরিবেশ এমন হওয়া দরকার, যেখানে সংসদ সদস্যরা কী করতে পারেন এবং কী পারেন নাতা স্পষ্ট থাকে। আজকের বাস্তবতায় জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থীরা নির্বাচনী এলাকায় যেসব সড়ক ও সেতু নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেন, তা স্থানীয় সরকারের আওতায় এবং তা পূরণ করার পদাধিকার সংসদ সদস্যদের নেই। এই মিথ্যাচারের সংস্কৃতি থেকে নির্বাচনী পরিবেশকে বের করে আনা জরুরি।

নির্বাচনের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো গোত্রপ্রধানদের পরিবর্তে উপযুক্ত আইন প্রণেতাদের জন্য সংসদের আসন নিশ্চিত করা। সংসদের উচ্চকক্ষের সংযুক্তি এই লক্ষ্যে কিছুটা অগ্রগতি আনতে পারে, তবে সেটিও যদি বিভিন্ন রাজপরিবারের মনমর্জির ওপর নির্ভর করে, তাহলে সংকট থেকেই যাবে।

গণভোট ও সংস্কার নিয়ে আমার ভাবনা খুব সরল। অন্তর্বর্তীকালীন ইউনূসের সরকারের সেইফ এক্সিটের ফ্যান্সি নাম হচ্ছে সংস্কার। এই জনপদের মানুষের মুক্তির লড়াই বিভিন্ন রাজপরিবারের বিবেচনার দারস্থ করেছে সংস্কারবিষয়ক জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। আর গণভোটের ব্যাপারে বলতে গেলে শূন্যের সঙ্গে যা-ই গুণ করা হোক, ফল শূন্যই থাকে।

নির্বাচিত সরকার তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণে বাধ্য নয়। কারণ নির্বাচনী জনসভার সঙ্গে যাত্রাপালার মঞ্চের গুণগত তেমন তফাত নেই। এবং এই গ্লোরিফায়েড যাত্রাপালার অভিনেতারাও কিন্তু বেশির ভাগই বিক্রয়যোগ্য। এদের অনেকে আবার ভাড়ায় চালিত।

নির্বাচিত সরকারের কাছে আমার কোনো প্রত্যাশা নেই। তবে নির্বাচনে ভোটদানকারী জনগণের কাছে কিছু চাওয়ার আছে। আপনারা নিজেদেরকে আপনাদের নেতাদের মতো বিক্রয়যোগ্য করে তুলবেন না। কারণ যে জনগণ পাঁচ বছরে এক দিন সামান্য কিছু নগদ পয়সা, বিরিয়ানি, ফুস-পানির (কোল্ড ড্রিকংস) লোভ সামলাতে পারে না, তাদের ভোটে নির্বাচিত হয়ে আসা কোনো লোক হাজার কোটি টাকার লোভ সামলাবেসে আশা করাই পাপ। নেতা নির্বাচন একটি সামাজিক ইবাদত। নিজেদের বিক্রি করে সেই ইবাদত সম্ভব নয়। নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় সমাজের বেশির ভাগ মানুষ দুর্নীতিগ্রস্ত থাকলে পুরো সমাজকেই পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়।

ওয়াশিংটনের পদক্ষেপ কি আঞ্চলিক ক্ষমতার নতুন যুগের সূচনা?

আরিয়াপালা যথীন্দ্র, ত্রিনকো সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (টিএসএসটি) প্রধান এবং শ্রীলঙ্কাভিত্তিক একজন স্বাধীন রাজনৈতিক বিশ্লেষক

ওয়াশিংটনের পদক্ষেপ কি আঞ্চলিক ক্ষমতার নতুন যুগের সূচনা?

ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানে এবং দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার ঘটনায় তীব্র সমালোচনা ও নিন্দার ঝড় উঠেছে। বর্তমানে মাদুরো নিউইয়র্ক সিটিতে বিচারের অপেক্ষায় রয়েছেন। আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, আন্তর্জাতিক রাজনীতি আন্তর্জাতিক আইনের দ্বারা নয়, বরং বৃহত্ শক্তি ও তাদের জোটের স্বার্থ দ্বারা পরিচালিত হয়। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের ভেতর থেকেও কেউ কেউ এই ঘটনাকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ‘মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির পুতিনায়ন’ (Putinization) বলে আখ্যা দিয়েছেন। তবে আরো গভীর প্রশ্ন হলো, কোনো একক প্রেসিডেন্ট কি যুক্তরাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো উপেক্ষা করে জাতীয় স্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, নাকি এসব পদক্ষেপ আসলে অঞ্চলজুড়ে মার্কিন আধিপত্যের ধারাবাহিকতারই প্রতিফলন?

 

ঐতিহাসিক তুলনা : পানামা ও ভেনেজুয়েলা

ওয়াশিংটনের পদক্ষেপ কি আঞ্চলিক ক্ষমতার নতুন যুগের সূচনা?পরাশক্তির প্রতিযোগিতার ইতিহাসে চোখ রাখলে বিস্ময়কর মিল পাওয়া যায়। ১৯৮৯ সালে প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডাব্লিউ বুশ পানামায় আগ্রাসনের নির্দেশ দেন এবং স্বৈরশাসক ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রের আইনে অভিযুক্ত করেন। বুশ প্রশাসনের এই হস্তক্ষেপের পক্ষে যুক্তি ছিল পানামা খাল চুক্তি লঙ্ঘন, মাদকপাচার এবং এক মার্কিন মেরিন কর্মকর্তাকে হত্যার অভিযোগ। ১৯৮৯ সালের নির্বাচনে নরিয়েগা ফলাফল বাতিল করে নিজের এক সহপাঠীকে প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করলে ওয়াশিংটন কঠোর পদক্ষেপ নেয়।

৩৬ বছর পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে প্রায় একই পথে হাঁটলেন। জাতিসংঘ এই পদক্ষেপকে সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন বলে নিন্দা করলেও ওয়াশিংটন তাতে বিশেষ গুরুত্ব দেয়নি। পুরো পরিস্থিতি যেন আগে পদক্ষেপ, পরে স্থিতিশীলতা নীতিতে পরিচালিত হচ্ছে। পানামা কিংবা ইরাকের মতোই, নতুন রাজনৈতিক সংকটের ঢেউ এলে এই ঘটনাও হয়তো দ্রুত আড়ালে চলে যাবে।

তবে দুটি ঘটনার মধ্যে পার্থক্যও আছে। পানামার ক্ষেত্রে নরিয়েগার জাতীয় পরিষদ যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল। ভেনেজুয়েলায় মাদুরো কোনো আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণা না করলেও কারচুপিপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় টিকে ছিলেন, যা নরিয়েগার কৌশলেরই প্রতিধ্বনি। উভয় ক্ষেত্রেই সামরিক হস্তক্ষেপের আগে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ ব্যর্থ হয়েছিল। রিগ্যান প্রশাসন নরিয়েগাকে সরাতে কূটনীতির আশ্রয় নিলেও তত্কালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট বুশ আপসের বিরোধিতা করেন। একইভাবে দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা মাদুরোকে সরাতে ব্যর্থ হলে ওয়াশিংটন শক্তি প্রয়োগে যায়।

 

সংঘাতের পথে ভেনেজুয়েলা

ভেনেজুয়েলা ও যুক্তরাষ্ট্রের টানাপোড়েনের শুরু হুগো শাভেজের উত্থানের পর, ১৯৯০-এর দশকে। তাঁর সমাজতান্ত্রিক নীতি ও মার্কিনবিরোধী বক্তব্য, পাশাপাশি চীন, ইরান ও রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ককে তীব্রভাবে টানাপোড়েনে ফেলে। ২০০২ সালে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত এক অভ্যুত্থান শাভেজকে উত্খাত করতে ব্যর্থ হয়। ২০১৩ সালে শাভেজের মৃত্যুর পর নিকোলাস মাদুরো সেই নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন এবং সংকট আরো গভীর হয়। ২০১৮ ও ২০২৪দুই নির্বাচনেই কারচুপির মাধ্যমে ক্ষমতা ধরে রাখেন তিনি প্রবল বিরোধিতার মধ্যেও। ট্রাম্প ২০২৫ সালের শেষ দিকে মাদুরোকে সরে দাঁড়াতে সতর্ক করলেও নিষেধাজ্ঞা ব্যর্থ হলে ওয়াশিংটন সামরিকভাবে শাসন পরিবর্তনের পথ বেছে নেয়।

এসব পদক্ষেপ ভেনেজুয়েলার বিপুল তেলসম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা বলে মনে হতে পারে। কিন্তু গভীরে গেলে এটি পশ্চিম গোলার্ধে আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রশ্ন। লাতিন আমেরিকায় চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি ওয়াশিংটনের জন্য বড় উদ্বেগ। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এ কথা স্পষ্ট করে বলেন, এটি পশ্চিম গোলার্ধ। এখানেই আমরা বাস করি এবং আমরা আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী ও শত্রুদের এখানে ঘাঁটি গড়তে দেব না।

মাদুরোকে আটকের কয়েক ঘণ্টা আগেই তিনি চীনা কূটনীতিকদের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারি পুনর্ব্যক্ত করেছিলেন।

২০১৭ সালে ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল চীনকে কেন্দ্র করে মহাশক্তির প্রতিযোগিতায় মনোযোগ দেওয়ার ঘোষণা দেয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের নতুন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে মাদুরো অপসারণকে মনরো নীতির পুনর্জাগরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়, যাকে বলা হচ্ছে ট্রাম্প করোলারি। সেখানে বলা হয়েছে, বহু বছরের অবহেলার পর যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম গোলার্ধে তার শ্রেষ্ঠত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবে, অ-গোলার্ধীয় প্রতিদ্বন্দ্বীদের এখানে শক্তি মোতায়েন বা গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিতে দেওয়া হবে না।

 

মনরো নীতি ও তার উত্তরাধিকার

১৮২৩ সালে ঘোষিত মনরো নীতি ইউরোপীয় শক্তিগুলোকে আমেরিকায় হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকতে সতর্ক করেছিল। ১৯০৪ সালে থিওডোর রুজভেল্ট এটি সম্প্রসারণ করে যুক্তরাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক পুলিশি ক্ষমতা প্রদান করেন। পরে ফ্রাংকলিন ডি রুজভেল্ট গুড নেইবার নীতির কথা বললেও শীতল যুদ্ধের বাস্তবতায় তা পুরোপুরি কার্যকর হয়নি।

সিআইএ লাতিন আমেরিকাজুড়ে ছায়াযুদ্ধ চালিয়ে একাধিক সরকার উত্খাত করে সোভিয়েত প্রভাব ঠেকাতে চেয়েছিল। সেই প্রেক্ষাপটে ভেনেজুয়েলা প্রথম নয়, এবং সম্ভবত শেষও নয়, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি কোনো নেতাকে উত্খাতে ভূমিকা রাখল।

 

আঞ্চলিক আধিপত্য : পুরনো ধারা, নতুন বাস্তবতা

প্রশ্ন হলো, ভেনেজুয়েলাতেই কি ওয়াশিংটনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেমে যাবে, নাকি এটি শীতল যুদ্ধ পরবর্তী সময়কার আঞ্চলিক আধিপত্যে ফেরার ইঙ্গিত? ইতিহাস বলে, ছোট রাষ্ট্রগুলো ভালো প্রতিবেশী হিসেবে আচরণ না করলে বড় শক্তির হস্তক্ষেপ অনিবার্য হয়ে ওঠে। দক্ষিণ এশিয়ায় ইন্দিরা গান্ধীর সময় ভারতের হস্তক্ষেপগুলো এই বাস্তবতার উদাহরণ। হেনরি কিসিঞ্জারের ভাষায়, শৃঙ্খলা তৈরি করতে হলে আগে অঞ্চলভিত্তিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে হয়।

এই প্রেক্ষাপটে ভেনেজুয়েলায় ওয়াশিংটনের পদক্ষেপ শুধু একটি কৌশলগত আঘাত নয়, বরং আঞ্চলিক আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার স্পষ্ট বার্তা। আবারও যেন সেই দরজা খুলে গেল, যেখানে খারাপ প্রতিবেশী তকমা পেলেই প্রতিবেশী রাষ্ট্রে সামরিক হস্তক্ষেপকে বৈধতা দেওয়া হয়। (অনূদিত) 

 

 

 

 

 

,

 

 

একান্ত সাক্ষাৎকারের মহিবুল ইসলাম মাসুম

ভিসার অপব্যবহার আর দালালচক্রে ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশি পাসপোর্ট

বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য বিদেশি ভিসা পাওয়া কেন ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে? কেন বাড়ছে রিজেকশন? কী ভুল করছেন আবেদনকারীরা? আর উত্তরণের পথ কোথায়? এসব বিষয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের সাবেক ইমিগ্রেশন ভিসা টিম লিডার মহিবুল ইসলাম মাসুম। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কালের কণ্ঠের নিজস্ব প্রতিবেদক জহিরুল ইসলাম

ভিসার অপব্যবহার আর দালালচক্রে ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশি পাসপোর্ট

অভিবাসন

কালের কণ্ঠ : বর্তমানে বাংলাদেশিদের জন্য বিদেশি ভিসা পাওয়া আগের চেয়ে কঠিন হয়ে উঠেছে। সামগ্রিক চিত্রটা কী?

মহিবুল ইসলাম মাসুম : এই মুহূর্তে সারা বিশ্বে দেড় থেকে দুই কোটি বাংলাদেশি বিভিন্ন দেশে বৈধ বা অবৈধভাবে বসবাস করছেন পড়াশোনা, কাজ বা অভিবাসনের উদ্দেশ্যে। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, আমেরিকা—সব জায়গায়ই বাংলাদেশিদের উপস্থিতি বাড়ছে। কিন্তু এই বিস্তারের পাশাপাশি একটি বড় সমস্যাও তৈরি হয়েছে—ভিসার অপব্যবহার। আজ যে কঠোরতা দেখা যাচ্ছে, তার মূল কারণ তিনটি—ভিসার মিসইউজ, ওভারস্টে ও ভুয়া ডকুমেন্ট। অনেকে ট্যুরিস্ট ভিসা নিয়ে গিয়ে কাজ শুরু করছেন। কেউ এক দেশে গিয়ে সেখান থেকে অন্য দেশে পালাচ্ছেন। কেউ স্টুডেন্ট ভিসা নিয়ে গিয়ে পড়াশোনা বাদ দিয়ে কাজ করছেন। এই ঘটনাগুলো বছরের পর বছর ধরে চলছে। ফলে দূতাবাসগুলো এখন বাংলাদেশি আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্ক। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে পাসপোর্টের ওপর আস্থা কমে যাওয়া, রাজনৈতিক অস্থিরতার ভাবমূর্তি, কূটনৈতিক দুর্বলতা এবং অদক্ষ শ্রমিক বেশি পাঠানো।

 

কালের কণ্ঠ : এটা কি সাময়িক সমস্যা, নাকি দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে?

মহিবুল ইসলাম মাসুম : এটা সাময়িক নয়। এখন দেশগুলো তথ্য শেয়ার করে। একবার যদি কোনো দেশের নাগরিকদের নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়, সেটা বদলাতে অনেক সময় লাগে। বাংলাদেশ এখন বহু দেশের কাছে ‘হাই রিস্ক প্রোফাইল’। ভবিষ্যতে বাংলাদেশিদের ওপর স্থায়ী বাড়তি ব্যাকগ্রাউন্ড চেক থাকতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তাদের নীতিগত কঠোরতা বাড়াচ্ছে। এটা সাময়িক বলা যাবে না, কারণ এর একটা দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে। একবার যখন একটা দেশের পাসপোর্টের ওপর বা একটা দেশের মানুষের ওপর, কর্মীদের ওপর, স্টুডেন্টদের ওপর এ ধরনের কোনো কলঙ্ক লাগে, সেটা কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকে, চর্চায় থাকে।

 

কালের কণ্ঠ : কোন কোন দেশের ভিসায় বাংলাদেশিরা বেশি জটিলতায় পড়ছেন?

ভিসার অপব্যবহার আর দালালচক্রে ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশি পাসপোর্টমহিবুল ইসলাম মাসুম : ভারত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ওমান, বাহরাইন, ইতালির ভিসা ও ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে জটিলতা বেড়েছে। অস্ট্রেলিয়ার ক্ষেত্রে সিকিউরিটি লেভেল বাড়ানো হয়েছে, কানাডা কঠোর যাচাই করছে, যুক্তরাষ্ট্র বন্ডব্যবস্থা, ইমিগ্র্যান্ট ভিসা স্থগিত ইত্যাদি পদক্ষেপ নিয়েছে। দেখা গেছে, স্টুডেন্ট, ওয়ার্ক ও ট্যুরিস্ট—সবখানেই সমস্যা, তবে কারণ আলাদা। স্টুডেন্ট ভিসার ক্ষেত্রে জাল অ্যাডমিশন লেটার, দুর্বল স্টাডি প্ল্যান, ব্যাকগ্রাউন্ডের সঙ্গে কোর্সের মিল না থাকা বড় সমস্যা। ওয়ার্ক ভিসার ক্ষেত্রে ভুয়া জব অফার, নকল ওয়ার্ক পারমিট, দক্ষতার প্রমাণ না থাকা বড় কারণ। ট্যুরিস্ট ভিসার ক্ষেত্রে ট্রাভেল প্ল্যান অস্পষ্ট, দেশে ফেরার নিশ্চয়তা দুর্বল, ওভারস্টের আশঙ্কা বিবেচনায় ভিসা মিলছে না। মোটকথা, বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য পৃথিবীটা এখন অনেক ছোট হয়ে এসেছে। শিক্ষা, শ্রমবাজার কিংবা ভ্রমণ—সব ক্ষেত্রেই আমাদের নাগরিকরা বাইরে যেতে আগ্রহী হলেও সততার অভাব রয়েছে। আরেকটি বড় সমস্যা হলো, অনেক গুরুত্বপূর্ণ দেশের দূতাবাস বাংলাদেশে নেই। ফলে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও ওই দেশগুলোতে ভিসাপ্রক্রিয়া জটিল হয়ে পড়ে।

 

কালের কণ্ঠ : জটিলতা এড়াতে সরকার ও আবেদনকারীদের কী করা উচিত?

মহিবুল ইসলাম মাসুম : বাংলাদেশের কূটনৈতিক হস্তক্ষেপ ও সক্রিয় তত্পরতা জরুরি। একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে, যাতে বাংলাদেশি নাগরিকরা ভুয়া কাগজপত্র, ভুয়া জব অফার বা ভুয়া ব্যাংক স্টেটমেন্ট ব্যবহার করে ভিসা পাওয়ার চেষ্টা না করেন। তা না হলে জটিলতা কমবে না, বরং বাড়বে। সবকিছুর মূলে দেখা যাচ্ছে, নথি জালিয়াতি, ভিসার অপব্যবহার ও ওভারস্টে। ট্যুরিস্ট ভিসা নিয়ে গিয়ে অন্য ভিসায় কনভার্ট করা, ভুয়া ব্যাংক স্টেটমেন্ট, ভুয়া জব অফার, দুর্বল ট্রাভেল হিস্ট্রি—এসবের কারণে রিজেকশন বাড়ছে। পাশাপাশি অনেক আবেদনকারী তাঁদের দেশে ফেরার নিশ্চয়তা ও আর্থিক স্থিতি বিশ্বাসযোগ্যভাবে উপস্থাপন করতে পারেন না।

কভিড-পরবর্তী বিশ্বে অভিবাসননীতিতেও কঠোরতা বেড়েছে। নিরাপত্তাঝুঁকি ও অতিরিক্ত অভিবাসনের চাপে ইউরোপ ও আমেরিকার মতো দেশগুলো স্ক্রুটিনি বাড়িয়েছে। অনেক দেশে অভিবাসীর সংখ্যা স্থানীয় জনসংখ্যার কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ায় সরকারগুলো নতুন করে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করছে। সর্বোপরি, বাংলাদেশি পাসপোর্টের ওপর আন্তর্জাতিক আস্থা কমে যাওয়াও বড় কারণ। অনেক দেশে ধারণা তৈরি হয়েছে, বাংলাদেশি আবেদন মানেই নথি জালিয়াতির ঝুঁকি বা ভিসার উদ্দেশ্য ভিন্ন হতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে নেপাল ভিসা নিয়ে গিয়ে সেখান থেকে অন্য দেশে পালানোর ঘটনাও ধরা পড়েছে। দালালচক্রের এসব তত্পরতায় দেশের পাসপোর্টের মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ফলে ভিসানীতি আরো কঠোর হয়ে পড়ে।

 

কালের কণ্ঠ : ভিসা আবেদন ও ভিসার ব্যবহারের ক্ষেত্রে আবেদনকারীর কোনো দুর্বলতা আছে কি না?

kalerkonthoমহিবুল ইসলাম মাসুম : ওপরের বিষয়গুলো বিভিন্ন দেশকে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রকে, বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা নিতে বাধ্য করেছে। আরেকটি বড় সমস্যা হলো, অনেক আবেদনকারী নিজের ভিসার শর্তগুলোই ভালোভাবে জানেন না। ফলে অনিচ্ছাকৃতভাবেও ভিসার নিয়ম ভঙ্গ হয়। এই ভিসা রুল কমপ্লায়েন্সের অভাবও কঠোরতার বড় কারণ। শেনজেন ভিসার ক্ষেত্রেও নিয়ম ভাঙা হয়। একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম হলো, শেনজেন অঞ্চলে ১৫ দিন থাকলে, যে দেশে সবচেয়ে বেশি সময় থাকা হবে, সেই দেশের ভিসা নিতে হয়। আর প্রবেশও সেই দেশ দিয়েই করা উচিত, যে দেশ ভিসা দিয়েছে। অনেকেই এ নিয়ম না মেনে অন্য দেশ দিয়ে প্রবেশ করেন। এতে ভবিষ্যত্ ভিসায় ঝুঁকি তৈরি হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে আরেকটি স্পর্শকাতর বিষয় হলো ‘বার্থ ট্যুরিজম’। কেউ ট্যুরিস্ট ভিসা নিয়ে গিয়ে সন্তানের জন্ম দেন, সন্তান মার্কিন পাসপোর্ট পায়, কিন্তু মা-বাবা ভিসার মেয়াদ শেষে দেশে ফিরে আসেন। পরে ভিসা নবায়নে জটিলতা দেখা দেয়, কারণ এই প্রক্রিয়াকে মার্কিন ভিসা কর্মকর্তারা ইতিবাচকভাবে দেখেন না। আবার অনেকে ট্যুরিস্ট ভিসা নিয়ে গিয়ে মেডিক্যাল ট্রিটমেন্টে ইনসু্যুরেন্স ব্যবহার করেন, এটিও সন্দেহের কারণ হয়। সব মিলিয়ে বলা যায়, ভিসার শর্ত ভঙ্গ, উদ্দেশ্য বদল, তথ্য গোপন এবং নিয়ম না জানা—এই চারটি বিষয়ই বর্তমান কঠোর ভিসানীতির বড় কারণ।

 

কালের কণ্ঠ : আবেদনকারীদের সবচেয়ে বড় ভুল কী? সরকারের কী করা উচিত?

মহিবুল ইসলাম মাসুম : আবেদনকারীদের সবচেয়ে বড় ভুল দালালের ওপর অন্ধ নির্ভরতা, ভুয়া কাগজ কপি-পেস্ট, অসামঞ্জস্যপূর্ণ স্টাডি প্ল্যান এবং শেষ মুহূর্তে আবেদন। দেখা গেছে, ভুয়া ব্যাংক স্টেটমেন্ট, জাল অ্যাডমিশন লেটার, জব অফার—এসব দালালচক্র বানায়। এতে শুধু ব্যক্তি নয়, পুরো দেশের আবেদনকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এটা জাতীয় ক্ষতি। কয়েকজন জালিয়াতের কারণে পুরো দেশের পাসপোর্ট সন্দেহের চোখে দেখা হয়। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশি শিক্ষার্থী নেওয়া বন্ধ করেছে।

 

কালের কণ্ঠ : ভুয়া ডকুমেন্ট দিলে শুধু আবেদনকারী নয়, পুরো দেশের আবেদনকারীদের ওপর কী প্রভাব পড়ে?

মহিবুল ইসলাম মাসুম : আমি আগেই বলেছি, ভুয়া ডকুমেন্টের ক্ষতি ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি সরাসরি জাতীয় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। কিছু মানুষ নিজের সুবিধার জন্য জাল কাগজপত্র দিয়ে ভিসা নেয়, পরে বিদেশে গিয়ে ধরা পড়ে, ডিপোর্ট হয়। কিন্তু এরপর সংশ্লিষ্ট দেশটি পুরো বাংলাদেশের আবেদনকারীদের ওপরই কঠোরতা আরোপ করে। ফলে যাঁরা সম্পূর্ণ জেনুইন ভ্রমণকারী, শিক্ষার্থী বা কর্মী, তাঁরাও ভোগান্তির শিকার হন।

অনেক সময় দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের আগের সার্টিফিকেট জাল, আইইএলটিএস সনদ জাল। এ ধরনের ঘটনা ধরা পড়লে পুরো দেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তখন ভিসা রিজেকশনের হার বেড়ে যায়, নতুন কঠোর নীতি আসে। কোথাও বন্ড সিস্টেম চালু হয়, কোথাও ভিসা স্থগিত হয়। যেমন—ভিয়েতনামের ক্ষেত্রে বাংলাদেশি কিছু নাগরিক ট্রাভেল ভিসায় গিয়ে কাজ শুরু করা বা সেখান থেকে অন্য দেশে পালানোর চেষ্টা করায় ভিসানীতি কঠোর করা হয়। ফলে একটি বিষয় স্পষ্ট, ভুয়া ডকুমেন্ট দেশের পাসপোর্টের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করে। একসময় দূতাবাসগুলো আলাদা করে বিচার না করে পুরো জাতিকেই উচ্চ ঝুঁকির হিসেবে দেখে।

কালের কণ্ঠ : সমস্যার সমাধানে বাংলাদেশ সরকারের কী কূটনৈতিক বা প্রশাসনিক উদ্যোগ দরকার বলে মনে করেন?

মহিবুল ইসলাম মাসুম : এই সমস্যার সমাধানে দুই স্তরেই কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। কূটনৈতিক পর্যায়ে করণীয়র মধ্যে রয়েছে—প্রথমত, ভিসা ও অভিবাসন ইস্যুতে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পরিমাণ বাড়াতে হবে। যে দেশগুলোতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থী, কর্মী ও ভ্রমণকারী বেশি যান, সেই দেশগুলোর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দূতাবাসগুলোর নিয়মিত যোগাযোগ থাকতে হবে। ভিসাপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও গতি নিশ্চিত করতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সমন্বিত কূটনৈতিক তত্পরতা প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত, দূতাবাসগুলোর ভূমিকা শুধু কনস্যুলার সেবা নয়, বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিংও। দক্ষ রাষ্ট্রদূত ও কর্মকর্তারা প্রবাসে বাংলাদেশের ইতিবাচক ইমেজ তুলে ধরতে পারেন। প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিয়ে সাংস্কৃতিক, একাডেমিক ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম আয়োজন করলে স্থানীয় সমাজের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ে, আস্থা তৈরি হয়। তৃতীয়ত, সরকারকে নতুন শ্রমবাজার ও শিক্ষা গন্তব্য খুঁজতে হবে। আমরা এখনো সীমিত কয়েকটি দেশের ওপর নির্ভরশীল। দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিক, শিক্ষার্থী ও পর্যটনের জন্য নতুন নতুন দেশের সঙ্গে চুক্তি করা দরকার। এ ক্ষেত্রে প্রবাসে প্রতিষ্ঠিত সফল বাংলাদেশিদের নেটওয়ার্ক কাজে লাগানো যেতে পারে।

এ ছাড়া প্রশাসনিক পর্যায়ে ভুয়া ডকুমেন্ট ও দালালচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালানো যেতে পারে। জাল স্পন্সরশিপ, ভুয়া জব অফার, ভুয়া ব্যাংক স্টেটমেন্ট—এসবের সঙ্গে জড়িত এজেন্সিগুলোকে আইনের আওতায় এনে বড় অঙ্কের জরিমানা ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। প্রয়োজনে আইন সংশোধন করতে হবে। একই সঙ্গে সরকার লাইসেন্সপ্রাপ্ত ও নিরাপদ এজেন্সির তালিকা তৈরি করতে পারে। নিয়মিত মনিটরিং, অডিট ও ইন্সপেকশনের মাধ্যমে তাদের কার্যক্রম তদারক করা উচিত। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে। 

 

 

 

ষড়যন্ত্রের কথা বলে মূল সমস্যাগুলো আড়াল করা হয় | কালের কণ্ঠ